Home » সাটুরিয়া জমিদার বাড়ি, ইতিহাস ঐতিহ্য এবং আভিজাত্যপূর্ণ সময়ের সাক্ষী

সাটুরিয়া জমিদার বাড়ি, ইতিহাস ঐতিহ্য এবং আভিজাত্যপূর্ণ সময়ের সাক্ষী

সাতুরিয়া জমিদার বাড়ি

বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণ ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির বাহক নিদর্শন রয়েছে যা দেশ, বিদেশের যেকোন পর্যটককে আকর্ষণ করতে পারে আর বলা যায় এই আকর্ষণের টানেই তারা বারবার ফিরে আসেন এদেশের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা পরিদর্শন করতে। এইসব স্থাপনার মধ্যে অন্যতম শীর্ষ স্থাপনা হচ্ছে সাতুরিয়া জমিদার বাড়ি। জায়গাটি আর কেউ নয় বাংলার বাঘ শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের বাসস্থান এটি।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত ঝালকাঠি জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত খুলনা-বরিশাল মহাসড়কের ঠিক পাশেই অবস্থিত এই সাতুরিয়া জমিদার বাড়ি। এটি মূলত রাজাপুর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। এখানে বাংলার বাঘ খ্যাত শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। আশেপাশের মানুষের তথ্যমতে, স্থাপনাটি সতেরশ সালের গোঁড়ার দিকে নির্মিত হয়েছিল।

এটি ছিল দুঃসাহসী নেতা ফজলুল হকের মায়ের বাড়ি। তিনি তার পুরো ছেলেবেলা এখানেই কাঁটিয়ে দিয়েছেন। শৈশবের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও এখানকার একটি মক্তবেই নিয়েছেন তিনি। ছেলেবেলা কাটানোর পর তিনি তার রাজনৈতিক জীবনের অনেক সময় এই বাড়িটিতেই ব্যয় করেছেন। এই বাড়িটি তাই ইতিহাসের অনেক উজ্জ্বল ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবেই বিবেচিত। শুরুতে বাড়িটিকে ‘’মিয়াবাড়ি’’ নামে ডাকা হত। এমনকি ঝালকাঠিকেও আগে ‘’বাকেরগঞ্জ’’ নামে ডাকা হত।

প্রায় তিন দশক আগের তৈরি এই ঐতিহাসিক বাড়িটি রাজাপুর উপজেলার বেকুতিয়া ফেরি ঘাটের পিছনেই অবস্থিত। পুরো জায়গাটিতে রয়েছে বিশাল ফুলের বাগান, অনেকগুলো পুকুর, তিনটি চমৎকার মুঘল স্থাপনা, এছাড়াও প্রাসাদের সামনে একটি প্রধান ফটক অবস্থিত। সমগ্র স্থাপনাটি বিশাল পরিমাণ প্রায় ১০০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত।

প্রাসাদটির প্রতিটি ভবনের দেয়ার অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন মুঘ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছে এবং প্রতি পাথর মুঘল সাম্রাজ্যের দর্শনীয় দিনগুলির কথাই যে কাউকে স্মরণ করিয়ে দেবে। ভবনটির মূল অংশে প্রবেশের জন্য রয়েছে একটি প্রধান ফটক। তবেঁ, সত্যি কথা বলতে এখন আর এই জমিদার বাড়ি আগের মত উত্তাপ ছড়ায় না। এর অনেক অংশই ক্ষয়ে গেছে সময়ের স্রোতে। এমনকি যে ১০০ একর জমির উপর এটি গড়ে উঠেছে তারও অনেক জায়গা এখন আর নেই। এখন পুরো জমিদারবাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে কমতে কমতে মাত্র ২৫ একর জমির উপর। জমির একটি বিশাল অংশই দখল করে নিয়েছে স্থানীয় লোকজন তাঁদের নিজেদের স্বার্থে।

এই বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় অনেক বাসিন্দাদের মনেও আক্ষেপ রয়েছে। আরও দুঃখজনকভাবে বলতে হচ্ছে বাংলাদেশের কোন সরকারই এই প্রাচীন স্থাপনাটি রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি। চুন, সুরকি খসে খসে পড়তে পড়তে পুরো প্রাসাদটিই যেন তার বর্ণ হারিয়ে ফেলেছে। ভীষণ রকমের এক জীর্ণশীর্ণ ও জরাজীর্ণ অবস্থার মধ্যে কাল অতিক্রম করছে এককালের ঐতিহাসিক এই জমিদার বাড়ি।

শৈশব কাটানোর পর পরিপূর্ণ কৈশোরে ফজলুল হক এই বাড়ির পুকুরে সাতার কাটতেন। কৈশোরেই তিনি সেখানকার কৃষকদের দুঃখদুর্দশা দেখে ‘’লাঙল যার জমি তার’’ এই আন্দোলনের ডাক দেন। এমনকি কৃষকডের নিয়ে কৃষক প্রজা পার্টিও গঠন করেন তিনি এখানে থেকেই।

অত্যন্ত দুঃখের বিষয় বাংলার ইতিহাসের অন্যতম এই সাহসী, বীরপুরুষের বাসস্থানটি আজ অযত্নে, অবহেলায় প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। এগিয়ে আসছে কোন সরকার, মন্ত্রী বা অন্যকেউ। বাইরে থেকে আসা দর্শনার্থীরাও বেশিরভাগই হতাশা হয়ে ফিরে যাচ্ছেন এর সামগ্রিক অবয়ব দেখে।

বর্তমানে এখানে ফজলুল হকের স্মরণে শেরে বাংলা পাঠাগারসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হয়েছে। রাজাপুর উপজেলার বেশ কিছু কর্মকর্তা এখানে ফজলুল হকের স্মরণে একটি জাদুঘর তৈরির বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।

যেভাবে যাবেন

ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চ বা স্টিমারে করে রাজাপুর ঘাট পর্যন্ত যেতে পারেন। রাজাপুর ঘাটে নেমে যেকোন পরিবহনে করেই এই জমিদার বাড়িতে যাওয়া সম্ভব। এছাড়াও, সড়কপথে যেতে চাইলে ঢাকার সায়েদাবাদ বা গাবতলি থেকে সরাসরি রাজাপুর যাওয়া যায়। সুগন্ধা, দ্রুতি, হানিফ ইত্যাদি পরিবহণ সরাসরি রাজাপুর পৌঁছে।

থাকার ব্যবস্থা

এখানে তেমন দামি বা ভাল হোটেল পাবেন না। সাধারণ মানের হোটেলেই থাকতে হবে। ধানসিঁড়ি রেস্ট হাউজ, হালিমা বোর্ডিং ইত্যাদি কিছু হোটেল আছে সদরে থাকার মত। ভাড়া পড়বে সাতশ থেকে বারশ টাকার মত।

খাওয়ার ব্যবস্থা

এখানে জমিদার বাড়ির আশেপাশে বেশ কিছু রেস্তোরাঁ পাওয়া যায়। এদের খাবারের মানও তুলনামূলক ভাল। তবেঁ, খুব বেশি আশা নিয়ে গেলে হতাশ হতে পারেন।

জমিদার বাড়িতে গিয়ে ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলবেন না। এগুলো আমাদের দেশেরই সম্পদ। আমাদেরই টিকিয়ে রাখতে হবে।